গ্রহ ও উপগ্রহের মধ্যে পার্থক্য: মহাকাশীয় বস্তুদের সম্পূর্ণ পরিচিতি

মহাবিশ্বের বিশালতায় অসংখ্য মহাকাশীয় বস্তু রয়েছে যা আমাদের সৌরজগৎ এবং তার বাইরে বিদ্যমান। এই বস্তুগুলির মধ্যে গ্রহ এবং উপগ্রহ দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যা আমাদের মহাজাগতিক পরিবেশ গঠন করে। গ্রহ ও উপগ্রহের মধ্যে পার্থক্য বোঝা আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি কারণ এটি আমাদের সৌরজগতের গঠন এবং কার্যপ্রণালী সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা প্রদান করে। গ্রহ এবং উপগ্রহ উভয়ই মহাকাশে বিচরণকারী বস্তু হলেও তাদের মধ্যে মৌলিক, গাঠনিক এবং কক্ষপথগত অনেক পার্থক্য রয়েছে। 

গ্রহ সূর্যের চারদিকে নিজস্ব কক্ষপথে ঘোরে, অন্যদিকে উপগ্রহ গ্রহের চারদিকে পরিভ্রমণ করে। এই নিবন্ধে আমরা গ্রহ এবং উপগ্রহের সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য এবং তাদের মধ্যে বিস্তারিত পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করব। আমাদের পৃথিবী একটি গ্রহ এবং চাঁদ তার উপগ্রহ, এই সহজ উদাহরণ থেকেই আমরা তাদের পার্থক্যের প্রাথমিক ধারণা পেতে পারি।

গ্রহ কী এবং তার মূল বৈশিষ্ট্য

গ্রহ ও উপগ্রহের মধ্যে পার্থক্য

গ্রহের সংজ্ঞা এবং শ্রেণীবিভাগ

গ্রহ হল একটি মহাকাশীয় বস্তু যা একটি নক্ষত্রের চারদিকে নির্দিষ্ট কক্ষপথে পরিভ্রমণ করে। আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান সংস্থার (IAU) সংজ্ঞা অনুযায়ী, একটি বস্তুকে গ্রহ হিসেবে বিবেচনা করতে হলে তাকে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয়। প্রথমত, এটি সূর্যের চারদিকে কক্ষপথে ঘুরতে হবে। দ্বিতীয়ত, এর নিজস্ব মাধ্যাকর্ষণ শক্তি যথেষ্ট শক্তিশালী হতে হবে যাতে এটি গোলাকার বা প্রায় গোলাকার আকৃতি ধারণ করতে পারে। তৃতীয়ত, এটি তার কক্ষপথের আশেপাশের এলাকা পরিষ্কার করে ফেলতে সক্ষম হতে হবে অর্থাৎ অন্যান্য ছোট বস্তুগুলিকে সরিয়ে দিতে বা নিজের মধ্যে শোষণ করতে হবে।

আমাদের সৌরজগতে মোট আটটি স্বীকৃত গ্রহ রয়েছে যা দুটি প্রধান শ্রেণীতে বিভক্ত। ভেতরের গ্রহগুলি হল বুধ, শুক্র, পৃথিবী এবং মঙ্গল যেগুলি পাথুরে এবং কঠিন পৃষ্ঠবিশিষ্ট। বাইরের গ্রহগুলি হল বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুন যেগুলি গ্যাসীয় দৈত্য এবং বরফ দৈত্য নামে পরিচিত।

See also  Smart Bangladesh Paragraph For Class 5,6,7,8,9,10

গ্রহের গঠনগত বৈশিষ্ট্য

গ্রহগুলি বিভিন্ন উপাদান দিয়ে গঠিত এবং তাদের গঠন তাদের অবস্থানের উপর নির্ভর করে। ভেতরের গ্রহগুলি প্রধানত লোহা, নিকেল, সিলিকেট এবং অন্যান্য ভারী উপাদান দিয়ে তৈরি। এগুলির ঘনত্ব বেশি এবং পৃষ্ঠ কঠিন। পৃথিবী এই শ্রেণীর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ যেখানে একটি কঠিন ভূত্বক, ম্যান্টেল এবং কেন্দ্রীয় কোর রয়েছে। বিপরীতে, বাইরের গ্রহগুলি মূলত হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, মিথেন এবং অ্যামোনিয়া গ্যাস দিয়ে গঠিত। বৃহস্পতি এবং শনি প্রধানত গ্যাসীয় যেখানে ইউরেনাস এবং নেপচুনে বরফের উপাদান বেশি।

উপগ্রহ কী এবং তার প্রকারভেদ

উপগ্রহ কী এবং তার প্রকারভেদ

উপগ্রহের সংজ্ঞা এবং প্রাকৃতিক উপগ্রহ

উপগ্রহ হল এমন একটি মহাকাশীয় বস্তু যা একটি গ্রহ বা অন্য বড় বস্তুর চারদিকে কক্ষপথে পরিভ্রমণ করে। উপগ্রহ দুই ধরনের হতে পারে – প্রাকৃতিক এবং কৃত্রিম। প্রাকৃতিক উপগ্রহ হল সেই মহাকাশীয় বস্তু যা প্রকৃতিগতভাবে গ্রহের চারদিকে ঘোরে, যেমন পৃথিবীর চাঁদ। চাঁদ আমাদের সবচেয়ে পরিচিত প্রাকৃতিক উপগ্রহ যা প্রায় ২৭.৩ দিনে পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করে। আমাদের সৌরজগতে বিভিন্ন গ্রহের অসংখ্য প্রাকৃতিক উপগ্রহ রয়েছে।

বৃহস্পতি গ্রহের ৯৫টিরও বেশি চাঁদ রয়েছে যার মধ্যে গ্যানিমিড সবচেয়ে বড় যা বুধ গ্রহের চেয়েও বড়। শনির প্রায় ১৪৬টি উপগ্রহ রয়েছে যার মধ্যে টাইটান সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কারণ এটির ঘন বায়ুমণ্ডল আছে। মঙ্গল গ্রহের দুটি ছোট উপগ্রহ রয়েছে – ফোবোস এবং ডিমোস। বুধ এবং শুক্র গ্রহের কোনো প্রাকৃতিক উপগ্রহ নেই।

কৃত্রিম উপগ্রহ এবং তাদের ব্যবহার

কৃত্রিম উপগ্রহ হল মানুষের তৈরি যন্ত্র যা বিশেষ উদ্দেশ্যে পৃথিবী বা অন্য গ্রহের কক্ষপথে স্থাপন করা হয়। ১৯৫৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্পুটনিক-১ ছিল প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ যা মহাকাশে প্রেরণ করা হয়। বর্তমানে হাজার হাজার কৃত্রিম উপগ্রহ পৃথিবীর চারদিকে ঘুরছে যা বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়। যোগাযোগ উপগ্রহ টেলিভিশন, ইন্টারনেট এবং টেলিফোন সেবা প্রদান করে। আবহাওয়া উপগ্রহ আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং জলবায়ু পর্যবেক্ষণে সহায়তা করে। জিপিএস উপগ্রহ নেভিগেশন এবং অবস্থান নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়। বৈজ্ঞানিক উপগ্রহ মহাকাশ গবেষণা এবং পৃথিবী পর্যবেক্ষণের কাজে নিয়োজিত থাকে।

গ্রহ ও উপগ্রহের মধ্যে পার্থক্য সমূহ

কক্ষপথ এবং পরিভ্রমণের পার্থক্য

গ্রহ ও উপগ্রহের মধ্যে পার্থক্য এর প্রথম এবং সবচেয়ে মৌলিক দিক হল তাদের কক্ষপথ এবং পরিভ্রমণের ধরন। গ্রহ সরাসরি সূর্য বা কেন্দ্রীয় নক্ষত্রের চারদিকে ঘোরে এবং তাদের কক্ষপথ সাধারণত উপবৃত্তাকার হয়। পৃথিবী প্রায় ৩৬৫.২৫ দিনে সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করে এবং এই পরিভ্রমণের কারণেই আমরা ঋতু পরিবর্তন দেখতে পাই। বৃহস্পতির মতো দূরবর্তী গ্রহের সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে প্রায় ১২ বছর লাগে। অন্যদিকে, উপগ্রহ কোনো গ্রহের চারদিকে পরিভ্রমণ করে।

See also  ঘন ঘন মাথা ব্যথার কারণ কি: সচেতন থাকার গুরুত্ব

চাঁদ পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘোরে এবং পৃথিবীর সাথে সাথে সূর্যের চারদিকেও ঘোরে। এভাবে চাঁদের একটি দ্বৈত গতি রয়েছে – এটি পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে এবং পৃথিবীর সাথে সূর্যকেও প্রদক্ষিণ করে। উপগ্রহের কক্ষপথের আকার এবং সময়কাল তার মূল গ্রহের দূরত্ব এবং ভরের উপর নির্ভর করে। বৃহস্পতির কিছু উপগ্রহ মাত্র কয়েক ঘণ্টায় প্রদক্ষিণ সম্পন্ন করে যেখানে অন্যগুলির কয়েক বছর লাগে।

আকার এবং ভরের পার্থক্য

আকার এবং ভরের দিক থেকেও গ্রহ এবং উপগ্রহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। সাধারণত গ্রহগুলি উপগ্রহের তুলনায় অনেক বড় এবং ভারী হয়। পৃথিবীর ব্যাস প্রায় ১২,৭৪২ কিলোমিটার যেখানে চাঁদের ব্যাস মাত্র ৩,৪৭৪ কিলোমিটার। বৃহস্পতি আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে বড় গ্রহ যার ব্যাস প্রায় ১,৩৯,৮২০ কিলোমিটার এবং ভর পৃথিবীর চেয়ে ৩১৮ গুণ বেশি। তবে কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। বৃহস্পতির উপগ্রহ গ্যানিমিড বুধ গ্রহের চেয়ে বড় এবং শনির উপগ্রহ টাইটানও একটি বড় আকারের উপগ্রহ।

ভরের পার্থক্য আরও স্পষ্ট। গ্রহের ভর তাদের নিজস্ব মাধ্যাকর্ষণ ক্ষেত্র তৈরি করতে যথেষ্ট শক্তিশালী যা তাদের চারপাশের বস্তুগুলিকে প্রভাবিত করে এবং উপগ্রহ ধরে রাখতে সক্ষম। পৃথিবীর ভর প্রায় ৫.৯৭ × ১০²৪ কিলোগ্রাম যেখানে চাঁদের ভর প্রায় ৭.৩৪ × ১০²² কিলোগ্রাম যা পৃথিবীর মাত্র ১.২%। এই ভর পার্থক্যের কারণেই উপগ্রহ গ্রহের চারদিকে আবদ্ধ থাকে এবং গ্রহ সূর্যের চারদিকে তার কক্ষপথ বজায় রাখে।

গঠন এবং বায়ুমণ্ডলের পার্থক্য

গ্রহ ও উপগ্রহের মধ্যে পার্থক্য তাদের গঠন এবং বায়ুমণ্ডলের ক্ষেত্রেও লক্ষণীয়। গ্রহগুলির সাধারণত জটিল অভ্যন্তরীণ গঠন থাকে যার মধ্যে বিভিন্ন স্তর রয়েছে। পৃথিবীতে একটি কঠিন অভ্যন্তরীণ কোর, একটি তরল বাহ্যিক কোর, একটি ম্যান্টেল এবং একটি ভূত্বক রয়েছে। গ্যাসীয় দৈত্যদের একটি ছোট পাথুরে কোর থাকতে পারে যা ঘন গ্যাস এবং তরল স্তর দ্বারা বেষ্টিত। অনেক গ্রহের ঘন বায়ুমণ্ডল রয়েছে যা বিভিন্ন গ্যাস দিয়ে গঠিত। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে নাইট্রোজেন এবং অক্সিজেন প্রধান যেখানে শুক্রের বায়ুমণ্ডল কার্বন ডাইঅক্সাইড দিয়ে পূর্ণ।

See also  Environmental Pollution Paragraph For Class 6,7,8,9,10 (100-200 Words)

বেশিরভাগ উপগ্রহের বায়ুমণ্ডল নেই বা খুবই পাতলা বায়ুমণ্ডল আছে কারণ তাদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি গ্যাস ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। চাঁদের কার্যত কোনো বায়ুমণ্ডল নেই এবং তার পৃষ্ঠ সরাসরি মহাকাশের শূন্যতার সংস্পর্শে আসে। তবে শনির উপগ্রহ টাইটান একটি ব্যতিক্রম যার একটি ঘন নাইট্রোজেন বায়ুমণ্ডল রয়েছে যা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের চেয়েও ঘন। বৃহস্পতির উপগ্রহ আইও আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপের কারণে একটি পাতলা সালফার ডাইঅক্সাইড বায়ুমণ্ডল রয়েছে।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

প্রশ্ন: গ্রহ এবং উপগ্রহের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
উত্তর: গ্রহ নিজেই সূর্যের চারপাশে ঘূর্ণায়মান একটি বড় আকাশযান, যা নিজের আলো দেয় না। উপগ্রহ অন্য গ্রহের চারপাশে ঘূর্ণায়মান একটি ছোট আকাশযান।

প্রশ্ন: সব উপগ্রহ কি গ্রহের চারপাশে ঘূর্ণায়মান?
উত্তর: হ্যাঁ, উপগ্রহ সবসময় গ্রহের কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান থাকে এবং নিজের আলো উৎপন্ন করতে পারে না।

প্রশ্ন: গ্রহের তুলনায় উপগ্রহের আকার কেমন?
উত্তর: সাধারণত উপগ্রহ গ্রহের তুলনায় ছোট। গ্রহ বিশাল হওয়ায় তার আকর্ষণ শক্তি উপগ্রহকে ধরে রাখে।

প্রশ্ন: গ্রহ ও উপগ্রহের কক্ষপথে পার্থক্য কী?
উত্তর: গ্রহ সূর্যের চারপাশে কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান হয়, আর উপগ্রহ সেই গ্রহের চারপাশে কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান থাকে।

প্রশ্ন: আমাদের চন্দ্র কি গ্রহ না উপগ্রহ?
উত্তর: চন্দ্র একটি উপগ্রহ, কারণ এটি পৃথিবীর চারপাশে ঘূর্ণায়মান এবং নিজস্ব আলো উৎপন্ন করতে পারে না।

উপসংহার

মহাকাশীয় বস্তুদের মধ্যে গ্রহ এবং উপগ্রহ দুটি স্বতন্ত্র শ্রেণী যাদের মধ্যে মৌলিক এবং কার্যকরী অনেক পার্থক্য রয়েছে। গ্রহ সরাসরি সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে, বড় আকার এবং শক্তিশালী মাধ্যাকর্ষণ ক্ষেত্র রয়েছে এবং তাদের নিজস্ব কক্ষপথ পরিষ্কার করে রাখে। অন্যদিকে, উপগ্রহ গ্রহের চারদিকে ঘোরে, তুলনামূলকভাবে ছোট এবং দুর্বল মাধ্যাকর্ষণ শক্তিযুক্ত। এই আর্টিকেলে আমরা গ্রহ ও উপগ্রহের মধ্যে পার্থক্য সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছি যা তাদের সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য, গঠন, কক্ষপথ, উৎপত্তি এবং বিবর্তন অন্তর্ভুক্ত করে।

আমাদের সৌরজগতে আটটি গ্রহ এবং শতাধিক প্রাকৃতিক উপগ্রহ রয়েছে যার প্রতিটি অনন্য বৈশিষ্ট্য এবং বৈচিত্র্য প্রদর্শন করে। পৃথিবী এবং চাঁদের সম্পর্ক আমাদের দেখায় যে কীভাবে একটি গ্রহ এবং তার উপগ্রহ পরস্পরের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে এবং একে অপরকে প্রভাবিত করে। গ্রহ ও উপগ্রহ উভয়ই মহাবিশ্বের জটিলতা এবং সৌন্দর্য প্রকাশ করে এবং আমাদের মহাজাগতিক পরিবেশ বুঝতে অপরিহার্য।